Breaking News
Home / Education / লটকন ফলের উপকারিতা (Benefits of Latkon Fruit)

লটকন ফলের উপকারিতা (Benefits of Latkon Fruit)

লটকন ফলের উপকারিতা 
লটকন ফলের উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করার আগে আমাদের দেশের লটকন ফলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করি। বাংলাদেশ একটি ষড়ঋতুর দেশ।  আমাদের দেশের বৈচিত্রতা আর আগের মত নেই বৈশ্বিক  কিছু কারণে তা পাল্টে গেছে। 
আমাদের প্রাকৃতিক গত অনেক বৈশিষ্ট্য পাল্টে গেলেও  আমরা এখন আশীর্বাদপুষ্ট । প্রতিটি মৌসুমী আমরা নানা রকম ফুল ফল শাকসবজি ইত্যাদি পেয়ে থাকে। যার ফলে আমাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে এবং আমাদের খাদ্যের যোগান সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর ফলে আমাদের নিজ দেশীয় শাকসবজি ফলমূল এর মাধ্যমে আমাদের চাহিদা পূরণ হয় তাই ভিনদেশী কোন শাকসবজি ও ফলমূল। আমাদের প্রয়োজন হয়না। 
লটকন বর্ষা  মৌসুমের একটি সুপরিচিত ফল। লটকন ফল  টক মিষ্টি স্বাদের হয়ে থাকে। ফলটি দেখতে ছোট হয় আকারে দুই থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। লটকন গাছের মধ্যে থোকায় থোকায় ধরে থাকে। Euphorbiaceae পরিবারের লটকন ফলের বৈজ্ঞানিক নাম  Baccaurea। বুনো গাছ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার  বিভিন্ন জায়গায় জন্মায়।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়ে থাকে। ইংরেজিতে লটকন কে  বার্মিজ গ্রেপ বলা হয়। আমাদের দেশে বুবি, বুগি, লটকা, লটকো, নটকো ইত্যাদি নামে ডাকা হয়ে থাকে। মার্চ মাসে লটকন গাছে ফুল আসে এবং পরিপূর্ণ ফল পেতে  চার-পাঁচ মাস সময় লেগে থাকে। জুন, জুলাই, আগস্ট মাসে বাজারে লক্ষণ দেখা যায় ।   

লটকন ফলের চাষ

কিছুদিন আগেও এই ফলটি আমাদের দেশে অপরিচিত ছিল। তবে যখন থেকে বাণিজ্যিকভাবে লটকন উৎপাদন  করা শুরু হয় তখন থেকে এর  চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। 
বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার লক্ষণ ফলন সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাজীপুর জেলায় ও লটকন  চাষ হয়ে থাকে। 
লটকন ফলের উপকারিতা সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো। 
পুষ্টি  নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের মতে। লক্ষণের কোন ক্ষতিকারক উপাদান নেই। ছোট থেকে বড় সবাই এ ফল খেতে পারেন। প্রচুর পরিমাণে খনিজ ও ভিটামিন রয়েছে লটকন ফলে 
লটকন ফলের উপকারিতা এর মধ্যে রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। দেহ গঠন ও কোষকলার সুস্থতায় কাজে লাগে। লটকনের রয়েছে অ্যামাইনো এসিড ও এনজাইম। লটকন ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি ফল। পরিমাণমতো লটকন সেবন করলে সারাদিনের ভিটামিনের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়।

ভিটামিন সি

প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি লটকনের বিদ্যমান। দৈনিক দুই থেকে তিনটি লটকন প্রতিদিনের ভিটামিন সি এর অভাব পূরণ করতে সক্ষম। ভিটামিন সি এর অভাবে দাঁত, মাড়ি ও  ত্বকের  বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। লটকন  দেহের হাড় দাঁতের মাড়ি এবং ত্বক সুস্থ রাখতে সহযোগিতা করে।

হজমশক্তি বাড়ায়

লক্ষণের প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। রুচি বাড়াতে লটকন এর ভূমিকা অপরিসীম। যা হজম শক্তি বাড়াতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। 

ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে

প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ লটকন ফল। ভিটামিন-সি আমাদের ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে বেশ উপকারী। ভিটামিন-সি ত্বকের লাবণ্য বহুবছর ধরে রাখতে সহায়তা করে থাকে। 

ভিটামিন বি সমৃদ্ধ ফল

লটকনের আরো রয়েছে ভিটামিন বি যা আমাদের চোখের রক্তনালীর  সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। লক্ষণের ভিটামিন বি-১ এর পরিমান ১০.০৪ মিলিগ্রাম এবং ভিটামিন বি-২ আছে ০.২০ মিলিগ্রাম। 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

ভিটামিন-সি মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। মন মেজাজ ভালো রাখতেও ভিটামিন সি ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি এর পরিপূর্ণ লটকন খেলে রোগ বালাই দৌড়ে পালাবে, এমনকি শরীরের নতুন করে কোন রোগ বাসা বাঁধতে পারবে। নিজেকে ফিট রাখতে সুস্থ থাকতে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর ফল খেতে হবে। 

প্রচুর ক্যালোরি

১০০ গ্রাম লক্ষ ৯৯২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। যা প্রায় দুই গুণ কাঁঠালে তুলনায়।যাদের সাধারণত প্রচুর পরিশ্রম করা লাগে এবং দূর্বলতায় ভোগেন নিয়মিত যদি তারা লটকন সেবন করে তাহলে শরীরে শক্তি পাবে।  এছাড়াও ১৭৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১৬৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৭৩ মিলিগ্রাম শর্করা, ১৭৭ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ১০০ মিলিগ্রাম লৌহ রয়েছে। 

ডায়াবেটিকস কমায়

লটকন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খুবই উপকারী এতে ক্যালরি ও ফ্যাট কম থাকে। নিয়মিত লটকন ফল সেবনে ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রনে রাখতে সহায়তা করে থাকে।  

হাইড্রেশন কমায়

লটকন  তৃষ্ণা নিবারণ করে  কারণ এতে জলীয় অংশের পরিমাণ বেশি থাকে। পানি ছাড়াও তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ফল খাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এটি রুচি বাড়াতে সাহায্য করে। 

অ্যানিমিয়া রোধে

অ্যানিমিয়া  বা রক্তশূন্যতা তৈরি হয় সাধারনত আয়রনের অভাবে। লটকনের প্রচুর পরিমাণে আয়রন বিদ্যমান রয়েছে। এইজন্য লক্ষণ রক্তশূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে। 

লাল চোখ নিরাময় করে

চোখ লাল হওয়া মূলত বিভিন্ন রোগের ইঙ্গিত হয়ে থাকে। অনেক কারনেই চোখ লাল হয়ে থাকতে পারে। চুলকানি থেকে শুরু হয় চোখ লাল হওয়া। চোখ লাল হওয়া কমাতে লক্ষণ খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে। 

পরিপাকতন্ত্রের সহায়তা

লক্ষণের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে। এই ফাইবার পরিপাকতন্ত্রের সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করে থাকে। যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবার রয়েছে ফলে। এই ফল অন্ত্র ও পাকস্থলীর মত পরিপাক  অঙ্গগুলো কার্যকারিতা উন্নত করে থাকে। 

রক্তে শর্করার মাত্রা বজায়

লটকনের অতিরিক্ত চিনি উপাদান নেই, তাই এটি শরীরের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায় না। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখতে খুবই উপকারী লটকন ফল। 

চর্ম রোগ নিরাময়

চর্ম রোগের জন্য লটকন ফল  খুবই শক্তিশালী মনে করা হয়। ফল টি  বিভিন্ন চামড়ার রোগ। যেমন চুলকানি, পানু, খোসপাঁচড়া ও দাদ সারাতে  সক্ষম। পদ্ধতিটি খুবই সহজ, ফলটি বেটে ক্ষতস্থানে লেপে  দিতে হয়।  

বমি বমি ভাব

বমি বমি ভাব দূর করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে লটকন ফল। লটকন ফল সেবনের বমি ভাব দূর হয়।  বমি বমি ভাব হলে লটকন  ফল খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।  

লটকন এর ঔষধি গুন

এই গাছে ফল নয় শুধু। এই গাছের শিকড় পাতা খেলে পেটের অসুখ ও জ্বর ভাব কমে যায়। লটকন গাছের শুকনো পাতার গুড়া ডায়রিয়া রোগের জন্য খুবই উপকারী। এই গাছের ছাল ও পাতা চর্ম রোগের জন্য খুবই উপকারী। 

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে

লটকনের রয়েছে বিশেষ উপকারী আয়রন যা রক্ত ও হাড়ের জন্য উপকারী।  রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা রয়েছে এ ফলে কারণ এতে রয়েছে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম। 

কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়

লটকন কঠিন অসুখ সারাতে সাহায্য করে থাকে ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়ামসহ নানারকম উপাদান রয়েছে যা  ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগ সারাতে সহযোগিতা করে। লক্ষণ ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও সহযোগিতা করে। বর্ষাকালে এই ফলটি প্রচুর পরিমাণে খেতে চিকিৎসকরা  পরামর্শ দিয়ে থাকে। 

শক্তির উৎস

শরীরে শক্তি বাড়াতে লটকন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খনিজ ও ভিটামিন প্রোটিন থাকে,যা খাওয়ার মাধ্যমে শক্তিতে পরিণত হয়। আপনার নিয়মিত খাবার তালিকায় লটকন ফল অন্তর্ভুক্ত করলে আপনি সারাদিন সক্রিয় থাকতে পারবেন। 

স্নায়ুর দুর্বলতা কমায়

কলার মতো পর্যাপ্ত পরিমান পটাশিয়াম থাকে লটকনে,যা স্নায়ুর দুর্বলতা কমাতে সহায়তা করে। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। সাথে একই হৃদরোগের ঝুঁকিও কমিয়ে থাকে। 

হার  সুরক্ষায় 

লক্ষণ কে ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, লটকন হার রক্ষায় ভূমিকা প্রদান করে থাকে। সঙ্গে আরও রয়েছে আয়রন, যার রক্ত ও হাড়ের জন্য বিশেষ উপকারী ভূমিকা পালন করে। 

গর্ভাবস্থার লটকন খাওয়া 

লক্ষণ বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুধু পরিচিত ফলেই না। লক্ষ প্রয়োজনীয় ফল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। অবস্থায় এই ফলটি আরো বেশি উপকারী হয়ে থাকে। তবে গর্ভাবস্থায় বেশকিছু সর্তকতা অবলম্বন করা প্রয়োজন হয়ে থাকে লটকন  খাওয়ার সময়। এছাড়াও লটকন ফলের উপকারিতার কিছু উদাহরণ সংক্ষেপে দেওয়া হল। 
লটকন ফল সেবনের শারীরিক দুর্বলতা, বুক ধড়ফড় করা, হাত পায়ে ব্যথা, ঠোঁট ও পায়ের তালু ফাটা, ঠোট  মুখের ঘা এবং বারবার গলা শুকিয়ে যাওয়া রোগীদের জন্য খুবই উপকারীভূমিকা পালন করে থাকে। 
গনোরিয়া রোগের জন্য লটকনের বীজ  উপকারী। মূল্যবান রং উৎপাদনে এর গাছ  ব্যবহার করা হয়। সিল্ক, তুলা ও পোশাকশিল্পে এ রং ব্যবহার করা হয়। 

বংশবিস্তার 

বীজ ও অঙ্গজ এই দুই পদ্ধতিতে লক্ষণে বংশবিস্তার হয়ে থাকে। লক্ষণের স্ত্রী ও পুরুষ গাছ আলাদা হয়ে থাকে। পুরুষ গাছের  সংখ্যা বেশি হয়ে থাকে যখন বীজ বীজ দ্বারা বংশবিস্তার করা হয় এবং ফল পেতে পাঁচ  বছর থেকে সাত বছর সময় লেগে থাকে। অঙ্গজ তথা কলম পদ্ধতি ব্যবহারে তিন বছরের মধ্যে ফল পাওয়া যায়। গাছ  তুলনামূলক ছোট হয় ফলে ফল সংগ্রহ করা সহজ হয়। একটি বয়স্ক গাছ থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টি ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা  বিক্রি করা হয় প্রতি কেজি। তবে  রাজধানী ঢাকাতে এর মূল্য ১০০ টাকার বেশি পাওয়া যায়। ছায়াযুক্ত স্থানে লটকন জন্ম নিতে পারে। এর ফলে বাড়ির উঠানে লটকন চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। 
লটকনের অনেক গুণ রয়েছে। এত উপকারিতা  থাকা সত্ত্বেও। একবারের বেশি লটকন না খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ এতে অনেক সময় ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। 
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা। লটকন ফলের উপকারিতা সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে পারি। লটকন ফল আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা অনুধাবন করতে পারি। লটকন ফল আমাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাণিজ্যিকভাবে লটকন ফল উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে ভালো ফলাফল পেতে পারি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *